ভূমি দূষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় ভূমি দূষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা

ভূমি দূষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা

 

ভূমি দূষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা

 

ভূত্বক বা ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পাতলা আবরণকে মৃত্তিকা বলে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি যেমন রোদ, বৃষ্টি, বায়ু প্রবাহ, পানি প্ৰোত, হিমাবাহ, অগ্ন্যুৎপাত, ভূমিকম্প এর প্রভাবে শিলারাশি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পৃথিবী পৃষ্ঠের ওপরের অংশে নরম আবরণ সৃষ্টি করেছে। পৃথিবী পৃষ্ঠের ওপরের অংশের এই নরম আবরণকে মাটি বলে।

পরিবেশীয় সকল প্রকার কর্মকাণ্ড হয় মৃত্তিকার ওপরেই। যার দরুন তৈরি হয় ভূমি ব্যবহার। যেমন- প্রতিবেশভিত্তিক ভূমি ব্যবহার, নগর ভূমি ব্যবহার, গ্রামীণ ভূমি ব্যবহার, কৃষিজ ভূমি ব্যবহার, শিল্পজ ভূমি ব্যবহার প্রভৃতি। ভূমির এইরূপ বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারের জন্য তৈরি হয় ভূমি দূষণ।

নির্দিষ্ট প্রতিবেশের খাদ্যশৃঙ্খলে যদি কোনো দূষণ ঘটে সেই দূষণের শিকার হয় পরোক্ষভাবে মানুষ। জীবনের অস্তিত্বের স্বার্থে প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে পরিবেশগত সকল ধরনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে এবং টেকসই ভূমি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন ভূমি ব্যবস্থাপনা ।

ভূমি দূষণের কারণ

বিভিন্ন ধরনের দূষক পদার্থ দ্বারা বায়ু, পানি, মাটি অর্থাৎ পরিবেশের প্রত্যেকটি উপাদান কোনো না কোনোভাবে দূষিত হচ্ছে। আবার পরিবেশের কোনো একটি উপাদান দূষিত হলে পরিবেশের অন্যান্য উপাদানও দূষিত হয়। যেমন- পানি দূষণের কারণে মাটিও দূষিত হচ্ছে। ভূমি দূষণের উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ নিম্নরূপ :

  • শিল্প বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, জমাকৃত আবর্জনা এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা বৃহৎ এলাকার ভূমি মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে ভূমিকে দূষিত করছে। শিল্পায়ন এবং নগরায়নের ফলে শিল্পজাত বর্জ্য, নগরের গৃহস্থালির আবর্জনা বিশেষ করে নগরের প্লাস্টিক বর্জ্য ভূমিকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
  • কৃষিকাজের জন্য রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার দীর্ঘদিন যাবৎ ভূমির উর্বরতা হ্রাস করে পাশাপাশি মাটিতে বসবাসকারী কেঁচোসহ উপকারী অনুজীব ধ্বংস করে। এছাড়াও ক্রমাগত রাসায়নিক সারের ব্যবহারের ফলে ভূমিতে রাসায়নিক যৌগের পরিমাণ বাড়ে অপরদিকে হিউমাস ও নাইট্রোজেন এর মাত্রা কমে যায়। ফলশ্রুতিতে দীর্ঘমেয়াদি ভূমি দূষণ হয় ।
  • বিশাল অঞ্চলব্যাপী ভূমিতে লবণাক্ততা বাড়লে মাটির উর্বরতা হ্রাস পায়। যার দরুন ভূমি দূষণ হয়। সমুদ্র তীরবর্তী
    এলাকায় সাধারণত লবণাক্ততা অধিক পরিলক্ষিত হয়।
  • এসিড বৃষ্টিও ভূমি দূষণের কারণ। বৃষ্টির পানির সাথে সালফিউরিক এসিড, নাইট্রিক এসিড ও হাইড্রোজেন ক্লোরাইড মিশ্রিত থাকে বলে মাটি অধিক দূষিত হয়।
  • চিকিৎসা বর্জ্য, জাহাজ ভাঙ্গার বর্জ্য পানি দূষণের পাশাপাশি মাটিকেও দূষিত করে। ব্যাপকহারে বন উজাড়ের ফলে মাটির আর্দ্রতা এবং হিউমাস কমে গিয়ে মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস করার মাধ্যমে ভূমি দূষণ ঘটায়। এছাড়াও গাছপালার অভাবে ভূমি ধ্বস ঘটে। যার দরুণ প্রতিবেশের ক্ষতি হয়।

 

google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

ভূমি ব্যাবস্থাপনা

পরিবেশ দূষণের ফলাফল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানুষ ভোগ করছে। নির্দিষ্ট প্রতিবেশের খাদ্যশৃঙ্খলে যদি কোনো দূষণ ঘটে সেই দূষণের শিকার হয় পরোক্ষভাবে মানুষ। যেমন- দ্রুত ফলনের জন্য আনারস চাষে যে রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হচ্ছে তাতে ফলন বাড়লেও মানব স্বাস্থ্যের জন্য সেই আনারস মারাত্মক ঝুঁকি।

প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশগত মান উন্নয়ন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রশমনে টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দিতে হবে । সুতরাং, বলা যায়, জীবনের অস্তিত্বের স্বার্থে প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করতে পরিবেশগত সকল ধরনের দূষণ নিয়ন্ত্রণে ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন । নিম্নে ভূমি ব্যবস্থাপনা বর্ণনা করা হলো-

  • ভূমির যেহেতু বহুমুখী ব্যবহার হয় তাই ভূমি ব্যবস্থাপনায় কৃষিকার্য, মৎস চাষ, পশুপালন, শিল্পায়ন, বনায়ন, নগরায়ন ও গৃহায়ন প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ভূমিক্ষয়রোধ, লবণাক্ততার জন্য ভূমির অবক্ষয়, ভূমির উর্বরতা সংরক্ষণ, ভূমি . পুনরুদ্ধার, উপকূলীয় অঞ্চলের ভূমি উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য ভূমি দূষণের কারণ চিহ্নিত করে পৃথক পৃথক প্রতিবেশভিত্তিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ বান্ধব পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
  • মাটি খনন ও অপসারণ করে ভূমির প্রাকৃতিক ভূদৃশ্য (Landscape) বিনষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে ।
  • পাহাড় থেকে মাটি, সাদামাটি আহরণ করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা যাবে না। • পাহাড়ি নদীর তলদেশ থেকে অধিক পরিমাণে পাথর আহরণ সীমিত করতে হবে।
  • পাহাড়ের মাটি কেটে পাহাড় সমান করা প্রভৃতি প্রাকৃতিক পরিবেশ-প্রতিবেশ ক্ষতিকারক কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। এই ক্ষেত্রে ওয়াটারশেড ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
  • নদীনালা, খাল-বিল, হাওড়, বাঁওড়, জলাশয়, জলাভূমি, পুকুর প্রভৃতির প্রতিবেশভিত্তিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অরণ্যবিনাশ (Deforestration) সম্পূর্ণভাবে প্রতিহত করতে হবে।

 

ভূমি দূষণ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা

 

  • সিসা, পারদ, ক্রোমিয়াম, কপার, ধাতু মাটির সাথে মিশে জারিত হয়ে মাটি, পানি ও বায়ুর মারাত্মক দূষণ ঘটায়।
    এই কারণে ধাতব দূষণ যেন না ঘটে এই ধরনের শিল্প ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে।
  • সম্প্রতি ই-বর্জ্যের (e-Waste) ধাতব পদার্থ মাটি ও পানিতে মিশে দূষণ ঘটায়। যদিও রেডিয়েশনের মাধ্যমে সর্বাধিক দূষণ হয় ।

আরও দেখুন :

Leave a Comment