পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল

পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল

পৃথিবীতে জীবকূলের অস্তিত্ব ও মানবজাতির উন্নয়ন নির্ভর করছে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ওপর। বাংলাদেশে আবহাওয়া এবং জলবায়ুগত পরিবর্তনের ফলে উত্তরাঞ্চলে মরুময়তার প্রাথমিক লক্ষণ, নদনদীতে লবণাক্ততার বিস্তার, ভূমিক্ষয়, বনাঞ্চলের দ্রুত হ্রাস প্রভৃতি পরিবেশগত সমস্যা বিদ্যমান।

এছাড়াও রয়েছে বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুযোর্গ, পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রভৃতি বিবেচনা করে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রভৃতি বিবেচনা করে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল নির্ধারণ করা হয়। নিম্নে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল বর্ণনা করা হলো।

পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল

পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য নিম্নলিখিত হাতিয়ার ও কৌশল (Tools and Techniques) ব্যবহার করা হয়। যথা-

১. পরিবেশ নীতি

২.পরিবেশ নির্দেশক

৩.ইকো – ব্যালেন্স

৪.জীবনচক্র মূল্যায়ন

৫.পরিবেশ রিপোটিং

৬.পরিবেশ চার্টারস

পরিবেশ নীতি (Environmental Policy) :

পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পরিবেশ নীতি হলো পরিবেশের এমন এক ধরনের দলিল যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণের সকল বিধিবিধান থাকে। পরিবেশ নীতির মূল বিষয় হলো- বর্তমান প্রজন্মের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও যাতে মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে। এই উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের লিখিত নিয়ম নীতি ।

পরিবেশ নির্দেশক (Environmental Indicators ) :

পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহকে পরিবেশ ব্যবস্থাপনার নির্দেশক হিসেবে চিহ্নিত করে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা করা হয়। পরিবেশ ব্যবস্থাপনার নির্দেশকসমূহকে (Indicators) প্রধান পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- জলজ বা অ্যাকুয়াটিক পরিবেশ, ভূমি ও সম্পদ, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা, সম্পদ সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। চিত্র – ১১.২ লক্ষ করুন।

 

পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল

চিত্র – ১১.২ পরিবেশ ব্যবস্থাপনার নির্দেশকসমূহ

ইকো – ব্যালেন্স (Eco-Balance) :

প্রতিবেশভিত্তিক ব্যালেন্স বা সাম্যতা হলো প্রতিবেশের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যকার স্থির অবস্থা (Stable equilibrium) । প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য প্রতিবেশভিত্তিক সাম্যতা বা ইকো – ব্যালেন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জীবনচক্র মূল্যায়ন (Environmental Assesment) :

এটি পরিবেশের প্রভাব মূল্যায়নের একটি কৌশল। যে কোনো পণ্যের উৎপাদনের ক্ষেত্রে পণ্যটি পরিবেশবান্ধব কি না এবং পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে তা মূল্যায়ন করা হয়।

পরিবেশ রিপোর্টি (Environmental Reporting) :

পরিবেশ সম্পর্কে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশের প্রচারণা এবং প্রতিবেদন প্রকাশ করাকে পরিবেশ রিপোর্টিং বলে।

পরিবেশ চার্টার (Environmental Charters) :

পরিবেশগত চার্টারের মাধ্যমে পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

বাংলাদেশের পরিবেশ নীতির মূলবিষয়

পরিবেশের ওপর নির্ভর করছে উদ্ভিদ, প্রাণী ও জীবজগতের অস্তিত্ব ও মানবজাতির উন্নয়ন । পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিবেশগত মান উন্নয়নে অধিক জনসংখ্যা, নিরক্ষরতা, অপ্রতুল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, গণসচেতনতা অভাব, অপরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার, অধিক হারে নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও অবকাঠামো নির্মাণ প্রভৃতি প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখানো হয়।

এছাড়াও বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত সমস্যা হয়ে থাকে। এই কারণে পরিবেশনীতি প্রণয়নের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের পরিবেশনীতির মূল উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নে বর্ণনা করা হলো।

 

google news
গুগল নিউজে আমাদের ফলো করুন

 

  • প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা;
  • সকল উন্নয়ন কার্যক্রমে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি অপরিহার্য করা;
  • প্রাকৃতিক সম্পদের আহরণ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহার বিজ্ঞানভিত্তিক করা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ও প্রভাব বিবেচনা
    করতে হবে;
  • প্রাকৃতিক সম্পদের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের মূল্যায়নের সাথে সাথে প্রতিবেশ সেবারও (Ecosystem Services)
    মূল্যায়ন করতে হবে;
  • প্রতিবেশ সেবা গ্রহণ, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সকলের সাম্যতা এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য দরিদ্র ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে;
  • নতুন ও নবায়নযোগ্য সকল সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে;
  • জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন করতে হবে; * পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতিপূরণ এর ব্যবস্থা রাখা। এই ধরনের নীতিকে Polluter’s Pay Principal বলে;
  • জাতীয় নীতিসমূহে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে;
  • পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সুরক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার (Curative measures) চাইতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা (Preventive measures) কে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে;
  • পরিবেশগত উন্নয়ন পরিকল্পনায় অভিযোজন (adaptation) এবং প্রশমন (mitigation) কে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ;
  • প্রতিবেশ হতে প্রাপ্ত পণ্য ও সেবার (Ecosystem goods and Services) টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে; সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ‘3R’ নীতিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই ‘3R’ নীতি হলো- পুর্নব্যবহার (reuse), স্বল্প ব্যবহার
    (reduce) এবং পুনচক্রায়ন (recycle);
  • পরিবেশ নীতি ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে;
  • বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে টেকসই উৎপাদন ও ভোগ (Sustainable Production and Consumption) কে নিশ্চিত করতে হবে;
  • পরিবেশ দূষণ ও সংরক্ষণের জন্য অর্থ বরাদ্ধ রাখতে হবে; • পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্পসারণ করতে হবে;
    স্কুল কলেজের পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাসে পরিবেশ ও প্রতিবেশ উন্নয়ন ও সংরক্ষণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশের পরিবেশনীতির মূল বিষয়সমূহ নির্ধারণের পাশাপাশি পরিবেশনীতিতে পরিবেশ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহ চিহ্নিত করেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাতসমূহ হলো-

  • প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিধান এবং সার্বিক উন্নয়ন;
  • অভিযোজন কার্যক্রম;
  • স্বল্প কার্বন নিঃসারণ প্রযুক্তির আহরণ ও প্রচলন;
  • সর্বপ্রকার দূষণ ও অবক্ষয়মূলক কার্যক্রম সনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ;
  • সকল ক্ষেত্রে পরিবেশ সম্মত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ;
  • প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই, দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশ সম্মত ব্যবহার নিশ্চিতকরণ;
  • বিশ্ব পরিবেশ উন্নয়নে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সহযোগিতা করা;
  • পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য শিক্ষা, সক্ষমতা, জনসচেতনতা ও জনমত গড়ে তোলা;
  • পরিবেশ উন্নয়নে সরকারি বেসরকারি উদ্যোগ;
  • পরিবেশগত ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট;

 

পরিবেশ ব্যবস্থাপনার হাতিয়ার ও কৌশল

 

  • ভূমি সম্পদ ব্যবস্থাপনা;
  • পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা;
  • বায়ু দূষণ, পানি দূষণ ব্যবস্থাপনা ।

আরও দেখুন :

Leave a Comment